ঘোষনা

”পরীক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে” “আপনিও আপনার লেখনি প্রতিভা প্রকাশ করতে পারেন চয়েন বার্তার মাধ্যমে”

Saturday, October 4, 2014

ফেসবুকের হাতছানি

                                                              ---মাসুদ রানা, বিনগ্রাম, সিংড়া, নাটোর।
আর সকলের মতই আমার বন্ধু-বান্ধব আছে। তাহাদের সাথে আড্ডা দিয়া, গল্পে গানে মাতিয়া উঠিয়া বেশ যাইতেছিল। হটাৎ আমাকে ফেসবুকে পাইল। আমার আর আগের মত আড্ডা গপ্ল গানে মাতিয়া থাকিতে ভাল লাগে না। সারাক্ষণ ফেসবুকেই মজিয়া থাকি। বাইরের দুনিয়ার চেয়ে ফেসবুকে ঘুরিঘুরিই আমার নেশা হইয়া গেল। আগে ছেলেরা উলটা পালটা মোবাইল নম্বর টিপিয়া বান্ধবী পাতাইয়া প্রেম করিবার চেষ্টা করিত। রাত জাগিয়া আন্দা
গোন্দা নাম্বার টিপাটিপি করা ছেলদের প্রধান নেশা ছিল। এখন আর সেই ঝামেলা নাই। ফেসবুকে মেয়ের অভাব নাই।তাহাদের সাথে বন্ধুত্ব পাতাইয়া চ্যাট করিয়া আমার ভালই যায়। মাঝে মাঝে দুই একটা মেয়ে রুপি ছেলের পাল্লায় পড়িয়া শেষে তাদেরকে হিজরা বলিয়া গালি দিয়া ব্লক মারিয়াছি।
মামুন ঠিক উলটা। ফেসবুক সে দুই চোখে দেখিতে পারে না। ফেসবুক ইউজ করিয়া ছেলেমেয়েরা যে উচ্ছন্নে যাইতেছে তার প্রধান নমুনা হিসেবে সে আমাকেই সাব্যস্ত করিত। এই জাতির অন্ধকার ভবিষ্যৎ নিয়া সে হর হামেশাই অতিশয় উদ্ভিগ্ন থাকিত। আর জাতির অগ্রগতির পথে যে সমস্ত বাধা আছে তাহার মধ্যে প্রধানতম হইল এই ফেসবুক। ছেলেমেয়েরা পড়ালেখা না শিখিয়া ফেসবুকিং করিতেছে। সারারাত চ্যাট করিয়া সকালে ক্লাসে ঝিমাইতেছে। ভবিষ্যতের জন্য যে একটা নিতান্ত বন্ধ্যা প্রজন্ম আসিয়া উপস্থিত হইতেছে এই দুশ্চিন্তায় তার ঘুম আসিত না। ইদানিং বন্ধুবান্ধব ত্যাগ করিয়াছি। তাহকে এখনো ত্যাগ করি নাই। সবাইকে তো আর ত্যাগ করা যায় না। কিন্তু তার আত্যাচার আর উপদ্রব দিন দিন বাড়িয়াই চলিতেছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমার ফেসবুকের পিছনে লাগিয়া থাকাকে সে নিজের মহান কর্তব্য করিয়া নিয়াছে। সকাল নাই সন্ধ্যা নাই সারাক্ষণ আমার সাথে তর্ক জুড়িয়া দিতে পারিলেই সে বাঁচিয়া যায়। সারাক্ষণ ফেসবুকের বিরুদ্ধে লাগিয়া থাকিয়া হাতের কাছে আমাকে পাইয়া সে আমাকেই ফেসবুক মনে করিয়া আমার গুষ্ঠি উদ্ধার করিতেছে। আমি সারাক্ষণ নতুন বান্ধবী, নতুন গ্রুপ, নতুন পেজ এই সব লইয়া মজিয়া থাকি। সুতরাং তার সাথে অকারণ তর্ক করিয়া বাজে সময় খরচ করার মত অত সময় আমার নাই। তাহাতে সে দমিয়া যাইবার পাত্র ছিল না। বরং দ্বিগুণ উৎসাহে সে কেন আমার ফেসবুকিং করা উচিত এই বিষয়ে বক্তৃতা দিতে শুরু করিত। অন্য কেউ হইলে হাতাহাতি হইয়া বন্ধুত্বের ইতি ঘটিত। কিন্তু মামুনের বেলায় আমি বরাবরই ছাড় দিয়া আসিয়াছি। মামুনকে কেন এত পছন্দ করি সে কথা আমিও ঠিকভাবে বুঝিতে পারি না।
দিনের দিনের পর পর দিন এই ভাবে আমাকে উৎপাত করিয়া সে ক্ষান্ত হইল না। একদিন সে ঘোষনা করিল সে দেশ জাতির কল্যাণ কামনায় ফেস বুকে জয়েন করিবে। আমি বেশ তাজ্জব হওয়ার ভান করিলেও মনে মনে বেশ খুশি হইলাম তাহার এতদিনের লম্বা লম্ব কথার বেশ একটা যুতসই জবাব দিতে পারিব বলিয়া। বলিলাম দেশ ও জাতির কল্যান কামনায় মিলাদ মাহফিল, দোয়া মোনাজাত হইতে দেখিয়াছি। কিন্তু ফেসবুকে একাউন্ট খোলা বোধ হয় এই প্রথম। এই দিক হতে তুই বেশ একটা রেকর্ড করলি। আমার উপহাস কে পাত্তা না দিয়া সে বলিল ফেসবুকের বিরুদ্ধে জাতিকে উদবুদ্ধ করিতেই সে ফেসবুকে জয়েন করিবে। আমার মত রংবাজি করিবার জন্য নহে। ফেসবুকে সে ফেসবুকের বিরুদ্ধেই প্রচারনা চালাইবে। জাতিকে সে বুঝাইবে কে আমাদের ফেসবুক ব্যবহার করা উচিত নয়। আমি মামুন কে চিনিতাম সুতরাং আগাগোড়াই বিশ্বাস করিলাম।
সত্যি সত্যি সে ফেসবুকে একাউন্ট খুলিল। দেশ জাতি রাষ্ট্র নিয়া লম্বা লম্বা বক্তৃতা দিতে লাগিল। তর তর করিয়া তাহার ফ্রেন্ড এবং ফলোয়ারের সংখ্যা বাড়িতে লাগিল। এখন সে আর আমার পিছনে লাগে না সারাক্ষণ ফেসবুকেই পড়িয়া থাকে। আমি হাঁপ ছাড়িয়া বাঁচিলাম। মাঝে মাঝে তার এই রকম ফেসবুকিং দেখিয়া মুখ টিপিয়া হাসিতাম। এই ভাবে আমাদের মামুন ফেসবুকে বেশ একটা সেলেব্রেটি তে রূপান্তরিত হইল। একদিন আমি বলিলাম ফেসবুকিং কেমন লাগিতেছে। আমার কথায় উত্তেজিত হইয়া সে বলিল তুমি ভাবিয়াছ তোমার মত উচ্ছন্নে যাওয়ার জন্যই আমি ফেসবুকিং করিতেছি। আমি মিশন লইয়া ফেসবুকে আসিয়াছি। এখন সময় হইয়াছে আমি আমার ফ্রেন্ড ও ফলোয়ারদের লইয়া ফেসবুক বিরোধি আন্দোলনে ঝাঁপাইয়া পড়িব। আমি কৌতুক বোধ করিলাম। বলিলাম, তোমরা কি ফেসবুকের বিরুদ্ধে হরতাম, অবরোধের মত কর্মসূচী দিব। সে জানাইল তাদের এই কর্মসুচী পুরোপুরো অহিংস। আমি বলিলাম সাধু!
আমি আমার মতই চলিতে ছিলাম। আমার ফেসবুকে পরিচিতের চেয়ে অপরিচিতের সংখ্যাই বেশি ছিল। বলাবাহুল্য তাহাতে ছেলে অপেক্ষা মেয়ের সংখ্যা অধিক। জগতে আমার মতই অনেক মেয়ে রাত্রি জাগিয়া ফেসবুক লইয়া পড়িয়া না থাকিলে আমার পক্ষে দুনিয়ার জগতসংসার বাদদিয়া ফেসবুকে ঘরসংসার পাতিয়া বসা নিতান্ত অবিবেচকএর কাজ বলিয়া মনে হইত। একাধিক মেয়ের সাথে আমার ঘনিষ্টতা রহিয়াছে। তাহদের সাথে চ্যাট করিতে গিয়া আমার টাইপিং স্পিড নীলক্ষেতের টাইপিষ্টদের হারাইদিবার সক্ষমতা অর্জন করিল। বিদ্যুৎগতিতে আমাদের যে আলাপ চলে তাহা সভ্যসমাজে স্বীকার করা আমার মত অর্বাচীনের পক্ষেও অসম্ভব ছিল। চোখের নীচে কালি করিয়া রাত জাগিয়া আমি যে রসাস্বাধন করিতেছিলাম তাহা আমার একলার আর আমার অপরিচিত বান্ধবীদের নিজস্ব। ফেসবুকের নির্জনতা আমাদের আলাপকে অল্পদিনেই এমন এক স্থানে উপনীত করিল যেখানে কোন রাখঢাক সভ্যতা সুশীলতাকে বাহুল্যবোধ হইতে লাগিল। ক্লাসে সুশীলা মেয়েদের দেখিলেই আমার মনে হইত এইরকম ভদ্রতার লেবাস পরিয়া রাতের বেলা তোমরা কি কর তাহা আমার ভাল জানা আছে। ভাগ্যিস মামুন আমার এই রূপটি জানে না। জানিলে তাহার মত শুচিগ্রস্তলোক আমার ছায়া মাড়াইত কিনা সন্দেহ। আর আজকাল আমার সম্পর্কে ভাবিবার সময় তাহার নাই। সে সত্যি সত্যি ফেসবুকে তোলপাড় শুরু করিয়া দিয়াছে। ফেসবুক যে জাতিকে ধ্বংস করিতেছে ইহা অকুণ্ঠে বলিতে লাগিল। আমাদের যে ফেসবুকের ভার্চুয়াল জগত ফেলিয়া বাস্তবে ফিরিয়া আসা উচিত আর দেশ জাতি ভবিষ্যতের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করা উচিত এই মন্ত্র সে মুহুর্মুহু জপিতে লাগিল। তাহার ফলোয়ার বন্ধুরা দুইভাগে বিভক্ত হইয়া তাহাকে টানিয়া লইয়া চলিল। কেহ বলিল বাঙালি টেকনোলজি ইউজ করিতে জানে না। তা দ্বারা এ জাতি নিজেদের উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি করিয়া থাকে। আজকাল এমন হইয়াছে ছেলেরা পথে ঘাটে, ইস্কুল কলেজে ক্লাসে, বাথ্রুমে, অফিসে, আদালতে এমনকি মসজিদেও তাহারা ফেসবুক লইয়া পড়িয়া থাকে। ভার্চুয়াল জগতে পড়িয়া থাকিয়া তাহারা বাস্তবতা বিবর্জিত কান্ডজ্ঞানহীন দায়িত্বশূণ্য মাকালে রূপান্তরিত হইবে। কিভাবে এদেরকে রক্ষাকরা যায় এই নিয়েও ব্যাপক তর্ক বিতর্ক হইল। কেহ বলিল সকলের একযোগে ফেসবুক বন্ধ করে দেয়া উচিত কেহ বলিল তাহা একেভারে ভাল হয় না, বরং সীমিত আকারে ব্যবহার করা উচিত, আন্দোলনে যাওয়ার পরামর্শও অনেকে দিল। তথ্যমন্ত্রনালয়ে স্মারকলিপি, মানববন্ধন , অনশন সকল রকমের প্রস্তাবই আসিল। রিরুদ্ধমতও জোরালো। তাহারা ইহাদের কে প্রাচীন জরাগ্রস্থ অন্ধকারের পেঁচা বলিয়া গালি দিল। কেহ কেহ কান্ডজ্ঞানহীন মূর্খও বলিতেও দ্বিধা করিল না। যুগের সাথে তালমিলিয়ে না চলিলে যে কিরকম পিচিয়ে পড়তে হয় সে বিষয়েও বিস্তর আলোচনা হইল। দেশ জাতির কথা উঠিলে তাহরির স্কয়ারের দৃষ্টান্ত উত্থাপন করিয়া একেবারে দাঁতভাঙা জবাব দেয়ার চেষ্টা চলিল।
কিন্তু হটাৎ যেন একটা ছন্দপতন লক্ষ করিলাম। মামুন কে ফেসবুকে পাওয়া যায় না। রুমে তাহাকে পাইনা। আমি কথা কম বলিলেও সে কম বলিয়া থাকিতে পারে না। অনর্গল না বকিলে তাহার ভাত হজম হইতে আমি কখনো দেখি নাই। তাহার ভক্তরা নিজারা বাদানুবাদ করিতেছে কিন্তু তাহাকে আগের মত সরব দেখছি না। সুতরাং সে আবার কি নিয়ে পড়িল সে আমি কিঞ্চিত চিন্তিত হইলাম। সেদিন বিকেলবেলা কাঁটাবন মোড়ে একটি রেস্তোঁরার দোতালায় বসিয়া খাবারের অর্ডার দিব এমন সময় কোনার টেবিলে চোখ আটকিয়া গেল। মামুন অপরিচিত এক মেয়েকে নিয়া বসিয়া আছে। আমাকে দেখিয়াছে কিনা বুঝি নাই। আমি আমার খাওয়া শেষ করিয়া আমার বিলটি হাতে লইয়া তাহাদের টেবিলের পাশে গিয়ে বলিলাল স্যার বিল টা। আমার দিকে তাকাইয়া মামুন হাসিল। বুঝিলাম সে আমাকে আগে দেখিয়াছে। বেশি পীড়াপিরি করিতে হইল না। সে ঝাড়িয় কাশিল। ঝাড়িয়া কাশিলে যাহা বুঝিলাম তাহা হইল এই ফেসবুক বিরোধী আন্দোলনে সে যখন ফেসবুকেই ঝড় তুলিতেছিল, তখন এই নিরতিশয় সুন্দরি তাহার বিরুদ্ধে উঠিয়া পড়িয়া লাগিয়াছিলন। তবে আর সকলের মত তিনি প্রকাশ্যে কমেন্ট করিতেন না, তাহার কঠিন কঠিন সব যুক্তি মামুনের ইনবক্সে আসিয়া জমা হইত। অবশেষে ফেসবুক ফেসবুকের জায়গায় রহিল আর তাহারা দুইজন এই রেস্তোরাঁতে আসিয়া এক হইল।
মনে মনে ভাবিলাম সারাবছর ফেসবুকিং করিয়া একটা মেয়ের নাম্বার বাহির করিতে পারিলাম না, আর সে কিনা পুরো মেয়েটাকেই বাহির করিয়া আনিল। সে দিনই ফেসবুক একাউন্টটা ডিএ্যাক্টিভেট করিয়া দিলাম।

No comments:

Post a Comment